Quantcast
  • বৃহস্পতিবার, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭, ০৪ ‍্মার্চ ২০২১

বিরোধী দলবিহীন গণতন্ত্র!


প্রভাষ আমিন | আপডেট: ১৭:০৫, ফেব্রুয়ারী ১২, ২০২১
 
 
 
 



সম্প্রতি দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দুটি রিপোর্ট নিয়ে সরকারের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর অপরিবর্তিত থাকলেও তালিকায় দুই ধাপ অবনতি হয়েছে। আর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের চার ধাপ উন্নতি হয়েছে, বেড়েছে স্কোরও। যথারীতি সরকার গণতন্ত্র সূচক নিয়ে উচ্ছ্বসিত আর দুর্নীতি সূচক নিয়ে টিআই'কে গালমন্দ করছেন।তবে আমার কাছে দুটি সূচকই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। টিআই’এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের স্কোর আগের মতো থাকলেও তালিকায় দুই ধাপ অবনতি হয়েছে। তার মানে বাংলাদেশে দুর্নীতি আগের মতই আছে– বাড়েওনি, কমেওনি; অন্য দুই সূচকে ভালো করেছে বলে তারা তালিকায় এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশে দুর্নীতি বাড়েনি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এই দাবি আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। দুদিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিদায়ী চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, ‘সরকারি-বেসরকারি খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। মাঠপর্যায় থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত সবখানেই দুর্নীতি।’ দুদক চেয়ারম্যান যখন এই কথা বলেন, তখন, টিআই’এর রিপোর্ট আমি কীভাবে বিশ্বাস করবো? তবে আমার ধারণা সর্বগ্রাসী বিস্তারের কারণে দুর্নীতি এখন আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। পাসপোর্ট অফিসে টাকা দিলে তাড়াতাড়ি কাজ হবে, এটা সবাই জানে, কিন্তু এটাকে কেউ এখন আর দুর্নীতি মনে করে না। সবাই খুশি মনে টাকা দিয়ে কাজ করায়। দুর্নীতি সম্পর্কে আমাদের ধারণা পাল্টে গেছে বলেই দুর্নীতির ধারণা সূচকে আমাদের স্কোর পাল্টায় না।

তবে টিআই’এর রিপোর্টের চেয়েও আমার কাছে অবিশ্বাস্য লেগেছে ইআইইউ’র গণতন্ত্র সূচক। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তো বাংলাদেশে গণতন্ত্র ‘কোমায়’ চলে গেছে, নির্বাচন ব্যবস্থা বলে দেশে আসলে কিছু নেই। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এমন কোনও নাটকীয় উন্নতি হয়নি। বরং এই সময় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হয়েছে। নির্বাচনি ব্যবস্থা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষ তাদের অনাস্থা জানিয়েছে বারবার। তাহলে গণতন্ত্র সূচকে চার ধাপ উন্নতি হয় কী করে? ২০০৬ সালে চালুর পর প্রথম বছর বাদ দিলে এবারই নাকি বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে ভালো! ২০০৬ সালে চালুর বছরে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৬ দশমিক ১১। ২০০৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তা ৫ দশমিক ৫২ পয়েন্টে নেমে যায়। গতবছর এই স্কোর ছিল ৫ দশমিক ৮৮, তার আগের বছর ছিল ৫ দশমিক ৫৭। আর এবার হয়েছে ৫ দশমিক ৯৯। কোন যাদুমন্ত্রবলে গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের অবস্থার উন্নতি হলো, আল্লাহ জানে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন কাজীর গরুর মত- কেতাবে আছে, গোয়ালে নাই।

নির্বাচনি ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, সরকারে সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক অধিকার- এই পাঁচ মানদণ্ডে একটি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১০ ভিত্তিক এই সূচক তৈরি করে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। সব সূচক মিলিয়ে কোনও দেশের গড় স্কোর ৮ এর বেশি হলে সেই দেশে ‘পূর্ণ গণতন্ত্র’ রয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। স্কোর ৬ থেকে ৮ এর মধ্যে হলে সেখানে ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’, ৪ থেকে ৬ এর মধ্যে হলে ‘মিশ্র শাসন’ এবং ৪ এর নিচে হলে সে দেশে ‘স্বৈরশাসন’ চলছে বলে ধরা হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশে এখন মিশ্র শাসন ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুপস্থিত থাকলেও গণতন্ত্রের জন্য আমাদের তৃষ্ণাটা এখনও রয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক আমলে মারামারি, কাটাকাটি, হরতাল, অবরোধ, সংসদ বয়কটের তিক্ত স্মৃতি মানুষ ভুলে যায়নি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আমাদের অর্থনীতিকে আটকে রেখেছিল। গত একযুগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুবাদে অর্থনীতিতে দারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। উন্নয়ন বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বিস্ময়। কিন্তু উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গিয়ে বাংলাদেশকে গণতন্ত্র বিসর্জন দিতে হয়েছে। তবে গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো কোনও ব্যবস্থা এখনও নেই। রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করলে গণতান্ত্রিক পথেই এগুতে পারে উন্নয়নের গাড়ি।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল দরকার। তিনি বলেছেন, ‘আমরা অন্তত এটুকু দাবি করতে পারি যে আমাদের সরকারের আমলে... বিরোধী দলে থাকার অভিজ্ঞতা আমার আছে, তখন বিরোধী দলে থেকে কী কী সমস্যার মোকাবিলা করেছি সেটা আমরা জানি। এ কারণে আমরা কিন্তু আর সে সমস্যাগুলো সৃষ্টি করি না। যদিও এখন যেটা সমস্যা হয়েছে যে, বিরোধী দল বলতে যে দলগুলো আছে, তাদের নেতৃত্ব সেভাবে নেই বলে জনগণের আস্থা বিশ্বাসটা তারা সেভাবে অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল অবশ্যই দরকার, এতে কোনও সন্দেহ নেই। আমরা চাই আমাদের গণতান্ত্রিক ধারাটা অব্যাহত থাকুক এবং জনগণের জন্য আমরা যেন কাজ করার সুযোগ পাই।’

১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর থেকে গত চার দশকে রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনার ক্যারিয়ার দারুণ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। বেশিরভাগ সময় কেটেছে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে। তিনি যখন দেশে ফেরেন, তখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায়। এরপর এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে টানা লড়াই। অনুসারীরা তাকে ‘গণতন্ত্রের মানস কন্যা’ বলে ডাকেন। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল হেরেছে, হেরেছে ২০০১ সালের নির্বাচনেও। শেখ হাসিনার ক্যারিয়ারে জয় যেমন আছে, তেমনি পরাজয় আছে, লড়াই আছে। গণতন্ত্রটা এমনই। তবে ২০০৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর থেকে শেখ হাসিনা নিজেকে অন্য মাত্রায় তুলে নিয়েছেন, তিনি এখন আর নিছক বাংলাদেশের নেতা নন, তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। কিন্তু জীবনজুড়ে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা শেখ হাসিনার আমলেই দুটি খারাপ নির্বাচন হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন অংশগ্রহণমুলক ছিল না, কারণ বিএনপি অংশ নেয়নি। আর ২০১৮ সালে বিএনপি আসায় নির্বাচন অংশগ্রহণ হলেও বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। এ দুটি সংসদেই প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। আর জাতীয় পার্টি একইসঙ্গে বিরোধী দলে এবং মন্ত্রিসভায় থাকার বিরল রেকর্ড করেছে। তাই একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য শেখ হাসিনার আকাঙ্ক্ষাটা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারেরই নির্যাস। বরং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন দুটি শেখ হাসিনার ক্যারিয়ারের সাথে বেমানান।

এটা ঠিক গণতন্ত্র একটি বাইসাইকেলের মতো। ঠিকমত চলার জন্য দুটি চাকাই সচল থাকা জরুরি। এক চাকায় সাইকেল চলবে না। শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে ক্ষমতায় ভারসাম্য থাকে, জবাবদিহিতা থাকে। সরকার ভুল করলে শক্তিশালী বিরোধী দল তা ধরিয়ে দেবে, শুধরাতে বাধ্য করবে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন কার্যত বিরোধী দল নেই। সংসদের বিরোধী দল গৃহপালিত, রাজপথের বিরোধী দল নিষ্ক্রিয়। এ পরিস্থিতির জন্য বিরোধীদলগুলোর নিষ্ক্রিয়তা, দুর্বলতা, সন্ত্রাস, দায়িত্বহীনতা, আপসকামিতা তো আছেই; দায় নিতে হবে সরকারি দল আওয়ামী লীগকেও।

এক মঞ্জুর হত্যা মামলা দিয়ে এরশাদকে বছরের পর বছর ‘পোষ’ মানিয়ে রাখা হয়েছিল। অরেকদিন বন্দী থাকা পাখিকে ছেড়ে দিলেও যেমন সে উড়তে পারে না। তেমনি এরশাদের মৃত্যুর পরও জাতীয় পার্টি স্বেচ্ছায় পোষ মেনেই আছে। আর মামলা-হামলা, গুম-খুনে বিপর্যস্ত একদা প্রতাপশালী বিএনপি এখন বিপর্যস্ত। দলটির চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন দুজনই দন্ডিত। একজন গৃহবন্দী, অপরজন পলাতক। আজকের অবস্থার জন্য বিএনপির অতীত অনেক কর্মকান্ডের দায়। তবে গণতন্ত্রের স্বার্থে শক্তিশালী বিরোধী দল চাইলে বিরোধী মতকে রাজনৈতিক স্পেস দিতে হবে, কথা বলার সুযোগ দিতে হবে, গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনের অধিকার দিতে হবে, মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা উন্নয়ন অবশ্যই চাই, তবে তার আগে চাই গণতন্ত্র। আর গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী বিরোধী দল।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

***এই বিভাগে প্রকাশিত প্রবন্ধের/ কলামের/ নিবন্ধের দৃষ্টিভঙ্গি একান্ত লেখকের নিজস্ব যার সাথে সাতকাহনের সম্পাদকীয় কোন নীতিমালা প্রতিফলিত হয় না***