Quantcast
  • বৃহস্পতিবার, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০

চামড়ায় এ কী বিপর্যয়!


সাতকাহন ডেস্ক | আপডেট: ১১:০৮, অগাস্ট ০৫, ২০২০
 
 
 
 


দেশে করোনা মহামারী, বন্যার দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক বাজারে দর বিপর্যয় বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করে চামড়ার দর নির্ধারণ করে সরকার। গত বছরের চেয়েও প্রায় ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়ে দর নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত এই দর ছিল গত দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এরপরেও নির্ধারিত দরের অর্ধেকে এমনকি কয়েক ভাগ কমেও চামড়া বেচাকেনা হয়েছে।

দুই বছর টানা বিপর্যয়ের পর চামড়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখন হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। গত বছরের পর এবার নতুন এক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে চামড়া ব্যবসায়ীরা। দেশের অনেক স্থানে এ বছর লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র এক শ’ টাকায়। খাসির চামড়া ন্যূনতম দামেও বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিয়েছেন অনেক কোরবানিদাতা।

চামড়া শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত বছর ঈদুল আজহার মতো এবারো কোরবানির পশুর চামড়ার দর বিপর্যয় হয়েছে। ঢাকায় ১০০ টাকায়ও গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে। আর ছাগলের চামড়া অনেকে ফ্রি দিয়েছেন। অনেকে আবার ক্ষোভে খাসি বা ছাগলের চামড়া ফেলেও দিয়েছেন। আর দুই-চারজন ফড়িয়া ব্যবসায়ী দাম দিলেও তা এক বর্গফুটের নির্ধারিত দামে পুরো চামড়া কিনেছেন।এ বছর চামড়ার দামের বিপর্যয় ঠেকাতে ঈদুল আজহার আগে ব্যবসায়ীদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা। অর্থের ঘাটতি মেটাতে বিশেষ ঋণ সুবিধাও অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনকি কেস টু কেস ভিত্তিতে কাঁচা ও ওয়েটব্লু চামড়া রফতানির সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর পরেও চামড়ার দর মেলেনি। কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার নিয়ে হতাশাজনক পরিস্থিতি ছিল সর্বত্র।দেশে করোনা মহামারী, বন্যার দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক বাজারে দর বিপর্যয় বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করে চামড়ার দর নির্ধারণ করে সরকার। গত বছরের চেয়েও প্রায় ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়ে দর নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত এই দর ছিল গত দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এরপরেও নির্ধারিত দরের অর্ধেকে এমনকি কয়েক ভাগ কমেও চামড়া বেচাকেনা হয়েছে।

ঢাকার নির্ধারিত দর ছিল প্রতি বর্গফুট গরুর লবণযুক্ত চামড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। একটি ২০ বর্গফুট গরুর চামড়া ৩৫ টাকা বর্গফুট ধরে লবণযুক্ত দাম পড়ে ৭০০ টাকা। এবার প্রতি বস্তা ৫০ কেজি লবণের দাম ৮০০ টাকা গেছে। এমন আকারের একটি চামড়ায় ৭ কেজি লবণ ব্যবহার করলে ১১২ টাকা, শ্রমিকের মজুরি ১০ টাকা, আড়ত কমিশন ৮ টাকা ধরা হলেও মোট ব্যয় হবে ১৩০ টাকা। এই ব্যয় করে প্রতিটি চামড়ায় ৭০ টাকা মুনাফা করলেও ৫০০ টাকায় কেনার কথা। অথচ শনিবার ঈদের দিন ব্যবসায়ীরা এই চামড়া ১০০ থেকে ২০০ টাকায় কিনেছেন।চামড়ার দামের এই বিপর্যয়ের বিষয়ে অনেক ক্রেতাই জানান, ট্যানারিগুলো টাকা দেয়নি। কিভাবে চামড়া কিনবে আড়তদারেরা? ট্যানারি টাকা না দিলে কোনো বছরই কেনাবেচা জমে ওঠে না। গত দুই বছর ধরে ট্যানারি টাকা না দেয়ায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তারা। রবিউল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী জানান, মগবাজার থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা করে ১২টি চামড়া কেনেন তিনি। তার চামড়ার মধ্যে ছোট চামড়া দুইটি আর সব বড় চামড়া। চামড়া বিক্রির জন্য নেয়া হলে পাইকারি ক্রেতারা তার চামড়ার দাম বলেন কেনা দামের চেয়েও অনেক কম। অনেক দরকষাকষি করেও শেষ পর্যন্ত তিনি গড়ে ৩০০ টাকা করে প্রতিটি চামড়া বিক্রি করেছেন বলে জানান।

এ দিকে ঈদের পরের দিন পোস্তার আড়তে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত দাম দূরের কথা কেনা দামেও চামড়া বিক্রি করতে পারেননি অনেক খুচরা ক্রেতা। উল্টো লোকসান দিতে হয়েছে। এভাবে চামড়ায় লোকসান হওয়ায় এবার হাতেগোনা অল্পসংখ্যক ব্যবসায়ী চামড়া কিনেছেন। বেশির ভাগ চামড়া মাদরাসাগুলো নিয়েছে। তারা যে দাম পেয়েছে তা খুবই কম। ঢাকার চামড়ায় গত বছরের মতো একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

চামড়ার দামে এই চিত্র ছিল রাজধানী জুড়েই। ঈদের দিন সন্ধ্যায় পোস্তার আড়তে সারিসারি চামড়া বোঝাই ট্রাক ঢুকতে দেখা গেছে। ট্রাকে থাকা শ্রমিকদের কাছে কতদামে কেনা হয়েছে জানতে চাইলে তারা বলেন, ১০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে এ চামড়া কেনা হয়েছে। গত বছরও এমন দর ছিল। তবে এর আগের বছরে ভালো চামড়া দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত দরে তারা কিনেছেন।

এ বিষয়ে কাঁচা চামড়া আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান বলেন, আমরা টাকার অভাবে অনেক চামড়া কিনতে পারি না। অনেক ব্যবসায়ী আগের বকেয়া টাকাও এখনো পাননি। বকেয়া পাওনার ক্ষেত্রে সক্রিয় ট্র্যানারিগুলোর মধ্যে মাত্র চারটি ট্যানারি সম্পূর্ণ টাকা দিয়েছে। আর ৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা দিয়েছে ১৫টি ট্যানারি। বাকি ট্যানারিগুলো কোনো টাকা দেয়নি। ট্যানারি মালিকরা টাকা না দেয়ায় এবারো একই অবস্থা হয়েছে। শুধু ট্যানারি নয়, ব্যাংকগুলো ৬৮০ কোটি টাকা দেয়ার কথা বলছে। অথচ বাস্তবে ১৮০ কোটি টাকা পেয়েছে ট্যানারিগুলো। এর ফলে চামড়া কেনাবেচায় বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফিনিসড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন জানান, ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত চামড়া নির্ধারিত দরেই কিনবেন। যারা নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক দাম কমিয়ে কিনেছেন তাদের বিরুদ্ধে তদারকিতে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। প্রতি বছর ট্যানারি মালিকদের দোষারোপ করার খেলা চলছে। এটা হতে পারে না। মধ্যস্বত্বভোগীরা (আড়তদার) অতি মুনাফা করতেই চামড়ার দাম কমিয়ে কিনছেন।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, নির্ধারিত দরের চেয়ে কম দামে বেচাকেনার দায় আমাদের নয়। আমরা সবাইকে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে বলেছি। লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করলে নির্ধারিত দামে ট্যানারিগুলো চামড়া কিনবে।

চট্টগ্রামের পথেঘাটে কোরবানির চামড়া

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো থেকে জানান, কাঁচা চামড়ার আড়তদার সিন্ডিকেটের কারসাজিতে শেষ পর্যন্ত গরিবের হক কোরবানির পশুর চামড়া মূল্য না পেয়ে চট্টগ্রামের পথে পথে নষ্ট হয়েছে। সিটি করপোরেশনের হিসাবেই চট্টগ্রামে ২৩ সহস্রাধিক চামড়া নষ্ট হয়েছে। যদিও প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। গ্রামগঞ্জেও ক্রেতার অভাবে পথে পথে চামড়া পড়ে থাকতে দেখা যায় এবং শেষ পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়েছে।

কয়েক বছর আগেও একটি কোরবানির গরুর চামড়া ২০০০ টাকার বেশি দামে কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কিনে নিতেন, আর সেই টাকা পেত কোরবানির বিধান অনুযায়ী গরিব মানুষ। এখন সেই চামড়ার ক্রেতাও নেই অনেক ক্ষেত্রে। আবার মৌসুমি ক্রেতা থাকলেও দাম মিলছে ৫০-১৫০ টাকা। গত বছর চট্টগ্রামে প্রায় সোয়া লাখ চামড়া রাস্তায়ই নষ্ট হয়। এ বছর কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা গত বছরের পুনরাবৃত্তি হতে দেবেন না মর্মে ঘোষণা দিলেও অভিযোগ উঠেছে চামড়ার আড়তদারদের কারসাজিতেই বিপুল চামড়া এ বছরও নষ্ট হয়েছে।

চামড়া ব্যবসায়ীদের ভাষ্য মতে, একটি গরুর চামড়া সর্বনিম্ন ২০ থেকে ৩০ বর্গফুটের মতো হয়ে থাকে। গত ২৬ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঢাকার বাইরে কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়া বর্গফুটপ্রতি ২৮ থেকে ৩২ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। সে হিসাবে সরকার নির্ধারিত দামে একটি গরুর চামড়ার দাম ৫৫০-৯০০ টাকা পর্যন্ত হওয়ার কথা। কিন্তু মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লবণযুক্ত চামড়া কেনা হয়েছে ৩০০ টাকায়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে দরদামে সময় ক্ষেপণ করা হয় কিংবা কিনতে অনাগ্রহ প্রকাশ করা হয়। এভাবেই আড়তদার সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বিপুল চামড়া রাস্তার ওপরেই নষ্ট হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে এ বছরও চট্টগ্রাম মহানগরীসহ বিভিন্ন স্থানে অর্ধলক্ষাধিক চামড়া নষ্ট হয়েছে। একই সাথে হক বঞ্চিত হয়েছে দেশের বিপুল সংখ্যক গরিব মানুষ।

এ দিকে গত বছরের লোকসানের করুণ অভিজ্ঞতার কারণে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের ব্যাপক উপস্থিতি না থাকার সুযোগ নিয়েছেন আড়তদাররা। তারা এলাকাভিত্তিক প্রতিনিধি নিযুক্ত করে নামমাত্র মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করে নিয়েছেন। ছাগলের চামড়া নিয়ে এসেছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিনামূল্যে।

গত বছর কোরবানির ঈদে চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পেয়ে চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা রাস্তায় ফেলে গিয়েছিলেন লক্ষাধিক কাঁচা চামড়া। এ বছরও মুরাদপুর এবং আতুরার ডিপো এলাকার রাস্তার দুই ধারে পড়ে থাকে লবণযুক্ত এবং লবণবিহীন উভয় ধরনের চামড়ার স্তূপ। নগরীতে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া না কিনলেও নগরীর বাইরে যেসব মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কিনেছেন তারা আড়তদারদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে এসেই বিপত্তিতে পড়েন। নগরীর বাইরে সংগ্রহ করা এসব চামড়া কিনতে আগ্রহী নন আড়তদাররা। প্রতি পিস চামড়া গড়ে দেড় শ’ টাকায় কিনে এনে চামড়ার মূল্য দূরের কথা, পরিবহন খরচটুকুও আড়তদাররা দিতে রাজি হননি বলে অভিযোগ উঠেছে। কেনা দামের এক-তৃতীয়াংশ মূল্যও না পেয়ে বা শুধু পরিবহন খরচটুকুও উঠাতে না পেরে হাজার হাজার চামড়া রাস্তায় ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছেন ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। ফলে নগরী ও নগরীর বাইরে অর্ধলক্ষাধিক চামড়া নষ্ট হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

চট্টগ্রাম কাঁচাচামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল কাদের  চামড়া নষ্ট হওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেছেন কিছু চামড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় গরমের কারণে নষ্ট হতে পারে। চামড়া ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রক্রিয়াজাত করতে হয় জানিয়ে আড়তদারদের এই নেতা বলেন, অনেকেই যে পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করেছেন সে পরিমাণ জনবল নিয়োগ না দেয়ায়ও সময়মতো প্রক্রিয়াজাত করতে পারেননি, সাথে ছিল গরমের তীব্রতা। চট্টগ্রামে এবার সাড়ে তিন লাখের মতো চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

রাজশাহীতে দাম না পেয়ে নদীতে নিক্ষেপ, করোনায় রাজশাহীতে এবার কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হয়েছে পানির দরে। গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম ২০-২৯ শতাংশ কমিয়ে নির্ধারণ করেছিল সরকার। কিন্তু সেই দামও পাওয়া যায়নি। ছাগলের চামড়া রাজশাহীতে ৫ থেকে ৩০ টাকা এবং গরুর চামড়া ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা একটু বেশি দামে চামড়া কিনেছিলেন। তারা চরম ধরা খেয়েছেন। আড়তে বিক্রি করতে না পেরে সেই চামড়া পদ্মা নদীতেও ফেলে দিতে দেখা গেছে।

রাজশাহীর প্রকৃত ব্যবসায়ীরা জানান, এবার তারাই ঠিকমতো বাজার বুঝতে পারেননি। আর এক দিনের জন্য চামড়া কিনতে এসে মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও বোঝেননি। ফলে তাদের লোকসান হয়েছে বেশি।

ঈদের দিন রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চামড়া ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামও দিতে চাইছিলেন না। চামড়া দেখে তারা নিজেরা ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করছিলেন। ক্রেতা-বিক্রেতার কোনো দরকষাকষি দেখা যায়নি। একরকম নিজেদের নির্ধারণ করে দেয়া দামেই চামড়া কিনছিলেন ব্যবসায়ীরা। চামড়া নিতে তাদের খুব একটা আগ্রহও দেখা যায়নি। মাঝারি আকারের একটি গরুর চামড়া ৫০ থেকে ১৫০ টাকায় কিনতে দেখা গেছে। আর বড় আকারের গরুর চামড়ার দাম দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। ছাগলের চামড়ার দাম দেয়া হয়েছে ৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা।

জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার কুমরপুর গ্রামের বাসিন্দা আবু জাফরসহ সাত ব্যক্তি মিলে একটি গরু কোরবানি দেন। আবু জাফর জানান, আমাদের গরুটার দাম ছিল ৯০ হাজার টাকা। গোশত হয়েছে চার মণ। চামড়ার দাম পেয়েছি ২০০ টাকা। এ দামেও চামড়া কিনছিলেন না ব্যবসায়ী। একরকম জোর করেই তাকে চামড়াটা দেয়া হয়েছে। আমাদের এলাকায় পাঁচ টাকাতেও খাসির চামড়া বিক্রি হয়েছে।

এ দিকে দরদামে না হলে প্রকৃত ব্যবসায়ী চলে যাওয়ার পর কোথাও কোথাও সামান্য কিছু দাম বেশি দিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের চামড়া কিনতে দেখা গেছে। কিন্তু সেসব চামড়া আর কেনা দামেও তারা বিক্রি করতে পারেননি। এতে তারা লোকসানে পড়েন। রোববার সকালে রাজশাহী নগরীর আই-বাঁধ এলাকায় কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ীকে প্রায় দেড় হাজার গরু-ছাগলের চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলে দিতে দেখা গেছে। এসব ব্যবসায়ী জানান, তারা রাজশাহীর বিভিন্ন গ্রামগঞ্জ ঘুরে চামড়া কিনেছেন। তারপর বিক্রির জন্য রাজশাহী নগরীর রেলগেট এলাকায় আড়তে নিয়ে যান। কিন্তু তারা যে দামে কিনেছেন তার তিন ভাগের এক ভাগও দাম বলা হয়নি। এসব চামড়া তাদের অন্য কোথাও বিক্রি করতে বলা হয়। কিন্তু তারা খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, কোথাও চামড়ার চাহিদা নেই। তারা যে দামে চামড়া কিনেছেন তার অর্ধেক দামও পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই ক্ষোভে তারা এসব চামড়া নদীতে ফেলে দিচ্ছেন।

রাজশাহী চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদ সাংবাদিকদের জানান, ট্যানারি মালিকদের কাছে আমাদের বকেয়া টাকা পড়ে আছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে হাতেও টাকা নেই। সরকার কমিয়ে দাম নির্ধারণ করে দিলেও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছে সেই দামেও চামড়া কেনার টাকা নেই। ফলে কম দামে তারা চামড়া কিনেছেন। তিনি জানান, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা নিজেরা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা ঢাকায় ট্যানারি মালিকদের কাছে পাঠান না। তারা কেনার পর সেই চামড়া আবার প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছেই বিক্রি করেন। কিন্তু এবার তাদের কাছ থেকে চামড়া কেনার আগ্রহ নেই প্রকৃত ব্যবসায়ীদের। এ কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ দফতর সূূত্রে জানা গেছে, কোরবানির আগে জেলায় গরু-মহিষ ছিল প্রায় এক লাখ। আর ছাগল ছিল দুই লাখ ২৮ হাজার। অন্যান্য পশু ছিল ৪২ হাজার। সব মিলে কোরবানির জন্য পশু ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার। জেলায় আড়াই লাখের মতো পশু কোরবানি হওয়ার কথা। তবে প্রকৃত হিসাবটা এখনো প্রস্তুত হয়নি।