Quantcast
  • বৃহস্পতিবার, ২৫ আষাঢ় ১৪২৭, ০৯ জুলাই ২০২০

চিন্তার চেনা ঘরে, অচেনা ডর


সাতকাহন ডেস্ক | আপডেট: ১০:৫৪, জুন ২৭, ২০২০
 
 
 
 


নন্দিনী! আমার খুব ভয় করে, কোন একদিন বুঝি জ্বর হবে, দরজা দালান ভাঙ্গা জ্বর।তুষার পাতের মত আগুনের ঢল নেমে এসে নিঃশব্দে দখল করে নেবে এই শরীরের শহর বন্দর।বালিশের ওয়াড়ের ঘেরাটোপ ছিঁড়ে ফেলা তুলো এখন হয়েছে মেঘ, উড়ো হাঁস, সাদা কবুতর।নন্দিনী! আমার খুব ভয় করে, বড় ভয় করে-- আমার যা কিছু ছিলো সবই তো দিয়েছি, শুভঙ্কর। তোমার বাঘের থাবা তাও ভরে দিয়েছি খাবারে। চাঁদোয়ার মতো ঘন বৃক্ষ ছায়া টাঙ্গিয়ে দিয়েছি মাথার উপরে, ঠিক আকাশের মাপে মাপে বুনে। তবুও তোমার এত ভয়? তবুও কিসের এত ভয়?

আসলেই কিসের এতো ভয়?মৃত্যু মাথায় নিয়ে যে প্রাণের জন্ম।সে জন্মের দেয়ালে মৃত্যু ভয় লেগে থাকে ধারালো ছুরির মতো।কবি পূর্ণেন্দু পত্রীর 'কথোপকথ'নে প্রিয়তমার এমন সাহস গাঁথা শুভংকরকে কতোটা প্রাণ-প্রদীপ্ত করেছিলো তা না জানলেও,পৃথীবিময় এ দুঃসময়ে জ্বরের বিপরীতে সাহসের বড়ো সংকট আজ।প্রভুর শৃঙ্খলা ভেঙ্গে মানুষই তো নষ্ট করেছে পৃথীবির ভারসাম্য।ঘরে ঘরে জ্বরের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।বাড়ছে মৃত্যুর কাফন মোড়ানো কফিন।ক্ষুদ্র এক অনুজীবের দোর্দান্ড প্রতাপ জব্দ করেছে মহা-ক্ষমতার পরমানু শক্তিধরদেরও।দমবন্ধ পৃথীবি প্রাণ পেতে কতোটা সময় নেবে তাও অজানা।দেশে দেশে ভঙ্গুর হচ্ছে অর্থীনীতি। উন্নয়নের গতিশীলতায় রাশ টেনেছে স্থবিরতা। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন এখন গৃহবন্দি।দিনমজুরের মজুরিতে লেগেছে হাহাকারের শেকল। জ্বর শুধু শরীরই পোড়াচ্ছে না; পুড়ে তছনছ করে দিচ্ছে দেহাতি মানুষের আগামী।কাজ নেই, বেতন নেই, তাই নীরবে দিনে দিনে রাজধানী ছাড়ছেন অনেকে।বৌ বাচ্চা নিয়ে যারা সংসার পেতেছিলেন রাজধানীতে, পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে তারা খুঁজছেন মেসবাড়ীর ঠিকানা।এমন যখন মানুষের দৈন্যদশা তখন করোনা নিয়ে বিভ্রান্তি আর নানা রকমারি পরামর্শেরও শেষ নেই। আজ যেটিকে করোনার জন্য প্রয়োজনীয় বলা হচ্ছে সেটাকেই আবার কাল অপ্রয়োজনীয় বলছে অন্যদল।এই যেমন, করোনা আক্রান্ত হলে গরম পানি পান কিংবা আদা, লবঙ্গ দিয়ে গরম পানির বাষ্প নিলে রোগের উপশম হয় এমন ভেষজ চিকিৎসার পরামর্শ একদলের।

অথচ যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ রন একেলিস বলছেন, গরম পানীয় ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে, এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। CDC (Center for Disease Control), WHO(World Health Organization) আলাদা ঘোষণায় স্পষ্ট জানিয়েছে গরম পানির ভাঁপ বা গরম পানিতে বিভিন্ন স্পাইস মিশিয়ে খেলে তাতে করোনার কোনো উপশম হয় না! তবে পরিমিত মাত্রায় কুসুম গরম পানি পান ও ভেষজ উপাদানের স্বাস্থ্যকর গুনাগুন রয়েছে সত্য। কিন্তু তা করোনা নিরাময় করে এমনটা প্রমাণিত নয়।

এসবের বাইরে গোমূত্র, থানকুনি পাতা, হুজুরের স্বপ্নে পাওয়া ধন্বন্তরির গুজব ওষুধ তো রয়েছেই।রয়েছে হোমিওপ্যাথির 'আর্সেনিক এ্যালবাম'।করোনার চিকিৎসা আবিস্কারে প্রতিনিয়তই গলদঘর্ম হচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।আর সেজন্যই হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন, রেমডিসিভির, আইভারমেকটিন, ফাভিপিরাভীরসহ নানা ওষুধের পরীক্ষামূলক নাম শোনা যায় ক'দিন পরপরই।পরীক্ষা চলমান থাকার দরুণ এমন আরো অনেক নাম আসতেই থাকবে এটাই স্বাভাবিক।কিন্তু বাঁচার লোভে রোগের আগেই এসব ওষুধ ঘরে মজুদ করার হিড়িক শুধু নির্বুদ্ধিতাই নয় বিপদেরই নামান্তর।

বিজ্ঞানের বদৌলতে করোনাও হয়তো ধরাশায়ী হবে মানুষের মেধার কাছে।কিন্তু তার আগে এইযে ভয় আর মৃত্যু? এ থেকে নিস্তারের আপাত উপায়ের নামই হচ্ছে 'সচেতনতা'।আরেকটি অনন্য ও টেকসই পন্থা হলো শরীরের 'রোগ প্রতিরোধ' ক্ষমতাকে প্রবল ভাবে বাড়িয়ে তোলা। তাই দুর্বল রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে সচল করতে ফিরতে হবে কঠোর নিয়মতান্ত্রিক জীবনের দিকেই।

ইউরোপ-আমেরিকায় করোনার প্রকোপ এবং তাতে মৃত্যুর যে অনুপাতে হয়েছে,তার সঙ্গে এশিয়া অঞ্চলের তফাতটা অনেক।এমন পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক এই ভিন্নতাকে বিশ্লেষণ করার জন্য বিভিন্ন দেশের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য,রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, আবহাওয়া-জলবায়ু, করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স আলোচিত হচ্ছে।এমনকি অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন মুটিয়ে যাওয়া, ধূমপান অথবা অ্যালকোহল সেবনের মাত্রা,শরীরচর্চা না করাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও তুলনামূলক আলোচনার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে গবেষণায়। সে বিচারে জীবনযাপনের পদ্ধতি ও খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব এবং আমাদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া ও এ থেকে সুস্থ হওয়ার বিষয়গুলোও বিশ্লেষণ করছেন গবেষকরা।

যেভাবেই দেখা হোক না কেন, আপাতত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণের দিকে জোর দেয়ার মাধ্যমে ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই তা মোটামুটি নিশ্চিত।কিন্তু ঘরে ঘরে জ্বরের সাথে যে অনটনের করুণ গল্প বাড়ছে তা থেকে কি করে মুক্তি মিলবে?এমন প্রশ্নও উঁকি দিচ্ছে চিন্তার চেনা জগতে।প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে হঠাৎ করেই বিপুল অংকের যে অর্থ বরাদ্দ দেয়ার কথা বলে আসছিলো সবাই, তা হলেই কি এই ভঙ্গুর রুগ্ন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উঠে দাঁড়াত?এতে আপাত স্বস্তি খুঁজলেও টেকসই সমাধান মিলতো কি? যতক্ষণ পর্যন্ত বন্ধ না হবে রাজনৈতিক 'দুর্নীতি'র কালো থাবা ততক্ষন মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছবেনা স্বাস্থ্যসহ পূর্ণাঙ্গ কোন ধরনের সেবাই।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অংকের সাথে এদেশের সাধারণ মানুষের চেনা জানার যোগ খুবই কম। তারা বুঝে দু'বেলা খেয়ে পরে সুস্থতার সাথে বেঁচে থাকা। করোনার কোন চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি তাই এর যেমন হাজারো চিকিৎসা তেমনি অজানা আগামী নিয়েও হাজারো শঙ্কার হাতছানি এখন মনের নিভৃত কোণে।

জনগণের অভিযোগের আঙ্গুল যেদিকে কালে কালে তোলা থাকে সর্বদা, সেই সরকার বাহাদুর যদি দুর্নীতির পুষ্টতার অভিযোগ কাটিয়ে, জনস্বার্থের কথা ভেবে কঠোর ও মনোযোগী হয়ে উঠেন।তাহলে হয়তো এই মহামারী পরবর্তী সময়কে মোকাবেলা করা কিছুটা সহজ হতে পারে। আবার গড়পড়তা সবকিছুর জন্য সরকারকে দায়ী করে যাওয়া জনগণেরও উচিত হবে; ব্যক্তি পর্যায়ের সততা,সক্ষমতা আর সচেতনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি ভঙ্গুর আগামীর গায়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মলম লাগাতে এগিয়ে আসা। নয়তো করোনার জ্বর শরীরের সাথে সাথে পুড়িয়ে দেবে অনেক কিছুই।

 

লেখক : সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, এনটিভি