Quantcast
  • বৃহস্পতিবার, ২৩ বৈশাখ ১৪২৮, ০৬ মে ২০২১

করোনাকালে শিক্ষার বাস্তবতা


শাহানা হুদা রঞ্জনা | আপডেট: ১৮:৫৭, এপ্রিল ২১, ২০২১
 
 
 
 


আমাদের জন্য ভয়াবহ তথ্যটা হচ্ছে ২০২০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে অসংখ্য শিশু ঝরে পড়েছে শুধু করোনাকালে অভাবের কারণে। সানেমের এক গবেষণায় বলা হয়, ধারণা করা হচ্ছে শতকরা ৩০ জন ছাত্রছাত্রী আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসবে না। কারণ তাদের পরিবার কাজ হারাবে ও সংসারে অভাব বাড়বে।সুলেখার কষ্টটা আমি কল্পনাও করতে পারছি না। গত বছরের আগস্টে ওর সঙ্গে আমার পরিচয়। সুলেখা বলেছিল, ‘আন্টি আমি কীভাবে আবার স্কুলে যেতে পারব বলো তো?আমি বলেছিলাম, মা, করোনা শেষ হয়ে গেলে আবার তোমাদের স্কুল খুলবে; তুমি আবার স্কুলে ফিরে যাবে।উত্তরে সুলেখা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘আন্টি আমার স্কুল একদম বন্ধ হয়ে গেছে। আমি নিজে দেখেছি স্কুলের টেবিল, চেয়ার, বোর্ড সব বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। দরজায় তালা লাগিয়ে টু-লেট ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।আর আমরাও গোড়ানের বাড়ি ছেড়ে বাড়ি চলে যাচ্ছি। কারণ বাবার চাকরিও চলে গেছে।

আমার জীবনে এত কষ্টের অভিজ্ঞতা আর কখনও শুনেছি কি না, মনে করতে পারিনি।আট বছরের ছোট নাতনি সেদিন করুণ স্বরে বলল, ‘নানু আমরা কি স্কুলে গিয়ে আর কখনো ক্লাস করতে পারব নাকি ঘরে বসে ক্লাস করতে করতেই বড় হয়ে যাব?

‘আমি এক ক্লাস থেকে আরেকটা ক্লাসে উঠে গেলাম ক্লাসরুম, টিচার আর বন্ধুদের সামনাসামনি না দেখেই।ওর এই অনুভূতির সঙ্গে ভীষণ রকমের কষ্ট জড়িয়ে আছে। ঘরের বন্দি জীবনের সঙ্গে যখন পড়াশোনার করার মতো আরেকটি ‘কঠিন’ বিষয় যোগ হয়, তখন একটি শিশুর জীবন কতটা কষ্টের হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। শিশুকালে পড়াশোনা করাটা তখনই আনন্দময় হয়, যখন এর সঙ্গে স্কুল, স্কুলের মাঠ, পরীক্ষা, খেলাধুলা ও সহপাঠীদের সঙ্গে গল্প-গুজব করার বিষয়টি জড়িত থাকে।অপরদিকে মেহেরুন্নেছা নামের ১৪-১৫ বছরের একটি মেয়ে গ্রাম থেকে মোটামুটি পালিয়েই খালার হাত ধরে শহরে আমার কাছে চলেএসেছে। ও গ্রামের সরকারি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। স্কুল বন্ধ বলে পরিবার জোর করে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ও বিয়ে করবে না বলে এখানে চলে এসেছে।স্কুল খুললে চলে যাবে এই আশাতেই ছিল। কিন্তু নতুন করে করোনা শুরু হওয়াতে মেহেরুন্নেছা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেছে। সুলেখা, নয়নতারা ও মেহেরুন্নেছারা সবাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।মেহেরুন্নেছার দুশ্চিন্তার খুবই যুক্তিসংগত কারণ আছে। কারণ গত বছর দেশের এক কোটি ৯০ লাখ স্কুল শিক্ষার্থীর অধিকাংশই পড়াশোনার বাইরেই থেকে গেছে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাত মাসে দেশের ২১টি জেলার ৮৪ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিয়ে হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৮৯ জন স্বীকার করেছে, করোনাকালে তারা অপ্রত্যাশিতভাবে গর্ভধারণ করেছে। এসবই গতবারের করোনাকালের দুঃসহ অভিজ্ঞতার চিত্র। তাহলে কি আমরা একই অবস্থা আবারও প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছি?

যেসব মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে শতকরা ৫০.৬ জনের বিয়ে হয়েছে ১৬-১৭ বছরের মধ্যে। শতকরা ৪৭.৭ জনের বিয়ে হয়েছে ১৩-১৫ বছরের মধ্যে। এমনকি শতকরা ১.৭ জনের বিয়ে হয়েছে ১০-১২ বছর বয়সে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের করা ‘বাল্যবিয়ের অবস্থা দ্রুত বিশ্লেষণ: করোনাকাল ২০২০’ শীর্ষক এক জরিপ রিপোর্টে এই তথ্যগুলো উঠে এসেছে।উল্লেখ্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ের হার। শতকরা ৫১ জন। বাল্যবিয়ের হার বেশি, বিশ্বের এ রকম ১০টা দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আছে। করোনাকালে মেয়েশিশুরা যে কতটা অসহায় তা আবার প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফা করোনা শুরু হওয়াতে আবার নতুন করে এসব প্রশ্ন বা আশঙ্কা আমাদের সামনে এসেছে।

পিছনে ফিরে দেখছি যে, ২০২০ সালে অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের অন্যতম বড় চিন্তা ছিল করোনার পরে স্কুল খুললে বাচ্চাদের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা হবে কি? হলে কবে হবে? সিলেবাস কী হবে? ঘরবন্দি অবস্থায় অনলাইনে পড়াশোনা করা কতটা সম্ভব? আবারও এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রায় দুই কোটি শিক্ষার্থী পড়ছে প্রাথমিক স্কুল ও মাধ্যমিক স্কুলে। গত বছর সরকার ভেবেছিল ফাইনাল পরীক্ষা পিছিয়ে দেবে; সিলেবাস কমিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কোনো পরীক্ষা দিতে পারেনি। গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনাই করতে পারেনি।গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকায় বা শহরের বস্তিতে যে শিশুটি পড়ছে, যার স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা শেখা ছাড়া, শেখার আর কোনো উপায় নেই অথবা এমন অনেক ছাত্রছাত্রী আছে, যাদের অভিভাবকরা পড়তে পারেন না কিংবা তাদের পড়াশোনাতে সহায়তাও করতে পারেন না। তাদের অবস্থা খুবই করুণ হয়েছিল গত বছর।দূরশিক্ষণ ক্লাসের ব্যবস্থা গত বছর সফল হয়নি। এই ব্যবস্থায় টিভি, রেডিও, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সর্বোচ্চসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা মোটামুটি মুখথুবড়ে পড়ে। কারণ বাংলাদেশে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীর ইন্টারনেট অ্যাকসেস নেই এবং ইন্টারনেট ডাটা কেনার সক্ষমতাও নেই বললেই চলে।


এ বিষয়ে ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী গত বছর সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিংয়ের (সানেম) একটি সেমিনারে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘চর, হাওর ও চা বাগানের বাচ্চাদের স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট নেই। দেশের শতকরা ৪৪ ভাগ পরিবারের টেলিভিশনও নেই। তাহলে তারা কেমন করে অনলাইনে ক্লাস করবে?’মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তর স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মাধ্যমিক স্তরের যে পড়া প্রচার করতে শুরু করেছিল সরকারের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের সহায়তায়, যাতে মহামারিকালে বাচ্চারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। এটা ছিল একটা সাময়িক সমাধান এবং ফলাফল একদমই আশানুরূপ হয়নি। আর আমাদের মতো দেশে এটা দীর্ঘমেয়াদি কোনো উপায় নয়।আমাদের জন্য ভয়াবহ তথ্যটা হচ্ছে ২০২০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে অসংখ্য শিশু ঝরে পড়েছে শুধু করোনাকালে অভাবের কারণে। সানেমের এক গবেষণায় বলা হয়, ধারণা করা হচ্ছে শতকরা ৩০ জন ছাত্রছাত্রী আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসবে না। কারণ তাদের পরিবার কাজ হারাবে ও সংসারে অভাব বাড়বে। (সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন)আমরা দেখেছি অনলাইন শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রযুক্তিগত দুষ্প্রাপ্যতা, প্রান্তিকতা ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে সফল হয়নি। আমরা খুঁজে বের করতে পারিনি কত পরিবার খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে, কাদের প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নেই, কাদের হাতে টাকা নেই, কারা বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানোর বদলে কাজ করতে পাঠিয়েছে?ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গত বছর করোনাকালে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আমাদের শিক্ষাবছর কমাতে হবে। ১০ মাস করে হিসাব করলে তিন বছরে এই ৬ মাস সময়টা অতিক্রম করা যাবে। সিলেবাসও কমাতে হবে ১০ ভাগ।‘সময় নষ্ট কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। আসল চ্যালেঞ্জ ঝরেপড়ার হার কমানো। আমি জানি না স্যার বা স্যারের মতো বিজ্ঞজনেরা এবার কী ভাবছেন?’বিবিসির একটা খবর জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতকরা ৯৮ ভাগ হলেও শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক বলেছে, প্রাথমিকের ৬৫ ভাগ শিক্ষার্থী বাংলাই পড়তে পারে না। ইংরেজি আর গণিতে অবস্থা এর চেয়েও দুর্বল। এদের অনেকে অক্ষরও চেনে না। শিক্ষকরা মনে করেন এই বাচ্চাগুলোকে বাসায় পড়ানোর মতো কেউ নেই।এ ছাড়া শতকরা ৫০ ভাগ শিক্ষকের বছরের পর বছর কোনো প্রশিক্ষণও হয় না। ইউনেসকো বলেছে, বাংলাদেশে শিক্ষকদের এই ট্রেনিং পাওয়ার হার এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। এই যদি হয় সাধারণ সময়ে শিশুদের শেখার অবস্থা, তাহলে করোনাকালে দূরশিক্ষণের মাধ্যমে তারা কতটা শিখবে আর পরীক্ষাই বা কীভাবে দিতে পারবে? আর নতুন করে আরেকটি করোনার ধাক্কা তারা পড়াশোনা ছাড়া কীভাবে পার করবে?

গতবারের অভিজ্ঞতা বলে যে, ইংরেজি মাধ্যমের সব ছাত্র-ছাত্রীর জন্য অনলাইনে পড়াশোনা করাটাও ছিল কঠিন। কারণ সবার বাসায় কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন বাড়তি থাকে না।ফোনের মাধ্যমে পরীক্ষাও দেয়া যায় না। এই অনলাইনে ক্লাস করতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছেন প্রযুক্তি ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত নন এমন অভিভাবকরা। তারা বেশ বিপাকেই পড়েছেন শিশুকে অনলাইন ক্লাস করাতে গিয়ে।এরই মধ্যে অনলাইনে ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষা দিলেও সত্যিকার অর্থে খুবই নিরানন্দময় এই শিক্ষা গ্রহণ তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি তাদের জীবনে। চীন, জাপান, আমেরিকার মতো ফাইভজি ব্যবহারকারী দেশগুলো এই পরিবর্তনকে খুব সহজেই গ্রহণ করতে পেরেছে। তাদের স্লোগান ছিল, ‘যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকেই পড়াশোনা’। কিন্তু বাংলাদেশে তা সফল হয়নি, এবারও হবে বলে মনে হয় না।লকডাউনের ফলে আমাদের শিশু-কিশোর, তরুণরা বছরের পর বছর পড়ালেখা ছাড়া থাকতে পারে না। এটি মানসিক বিকাশের জন্য অনুকূল নয়। করোনা হয়তো চলে যাবে একদিন। সামনের দিনগুলোতে অর্থনৈতিক অবস্থা মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে। সেসব বিষয় ভেবে নিয়েই আমাদের করণীয় ঠিক করতে হবে।বাংলাদেশে প্রাইমারি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় পৌনে ছয় কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণ করছে। এদের জীবনের ক্ষতি মানে দেশের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক খাতের ভয়াবহ ক্ষতি। এই ক্ষতি পরিমাপ করেই শিক্ষা বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।আমরা আবার করোনাকালে প্রবেশ করেছি। গতবারে করোনাকালে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যে ধাক্কা খেয়েছে, সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই আমরা আবার দ্বিতীয় ধাক্কায় পড়েছি।করোনাকালে শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে চলবে, এ নিয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনাও নেই। আমরা এ বছর যে উদ্যোগই নেই না কেন তাতে লক্ষ রাখতে হবে, যেন অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সুবিধাবঞ্চিত ছাত্র-ছাত্রীরা যেন বাদ না পড়ে। বিকল্প উপায়ে কী শিক্ষা দেয়া যায়, তা দেখতে হবে। যদি করোনা চলতেই থাকে তাহলে এ বছর কী হবে ছাত্র-ছাত্রীদের? আবারও কি সেই একই পথ পরিক্রমণ করতে হবে? সরকার, বিশেষজ্ঞরা কী ভাবছেন?


লেখক: সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন