Quantcast
  • বুধবার, ৬ কার্তিক ১৪২৭, ২১ অক্টোবর ২০২০

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর : ঈদ-উল- আয্হা


মাও: কাউছার আহমেদ | আপডেট: ১৬:৫৬, জুলাই ২৯, ২০২০
 
 
 
 


ইসলামে, হিজরী ক্যালেন্ডারের ১২ তম চন্দ্র মাসের যিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানী করার সময় হিসেবে নির্ধারিত। এ দিনে বিশ্ব জুড়ে মুসলমানগণ কুরবানী দেয় যার অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার খুশীর জন্য নির্দিষ্ট দিনে একটি পশুকে জবেহ করা। ইহা পুত্রের পরিবর্তে ইব্রাহিমের একটি মেষের আত্মত্যাগের পুনরাবৃত্তি, যা মুসলমানদেরকে তাদের সময়, প্রচেষ্টা এবং সম্পদ নিয়ে এগিয়ে আসতে উজ্জীবিত করে থাকে।

আল্লাহ তা’য়ালা খানায়ে কাবাকে সম্মানিত করেছেন, মানব জাতির জন্যে, একইভাবে

তিনি সম্মানিত করেছেন (হজের) পবিত্র মাস ও কুরবানীর পশুকে এবং গলচিহ্নিত পশুগুলোকে, এটা এ জন্যে যে যাতে করে তোমরা জেনে নিতে পারো, আকাশমালা ও প্রথিবীর যেখানে যা কিছু আছে আল্লাহ তা’য়ালা তা সবই জানেন, অবশ্যই আল্লাহ তা’য়ালা সকল বস্তুর বিষয়ে অবগত।” (সূরা মা য়িদাহ-৯৭)

যাতে করে তারা তাদের নিজেদেরই ফায়দার জন্যে (সময়মতো) এখানে এসে হাযির হয় এবং নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহ প্রদত্ত পশু (কুরবানী করার) সময় তার ওপর আল্লাহ তা’য়ালার নাম নেয়, অতপর (কুরবানীর) এ গোশত থেকে কিছু তোমরা খাবে, দুস্থ এবং অভাবগ্রস্তদের ও তার কিছু অংশ দিয়ে আহার করাবে।” (সূরা আল হাজ-২৮)

কুরবানী (আরবি), কুরবান অথবা আদ্বহা বা আযহা হিসাবে উল্লেখ করা হয়, যা ঈদ উল আযহার সময় পশু উৎসর্গের অনুষ্ঠান। কুরবানী শব্দটি হিব্রু কোরবান আর সিরিয়াক ভাষার কুরবানা শব্দদুটির সংগে সম্পর্কিত যার আরবী অর্থ "কারো নিকটবর্তী হওয়া"। ইসলামি মতে কুরবানী হচ্ছে নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার লাভের আশায় নির্দিষ্ট পশু জবেহ করা। মুসলমানদের পবিত্র আল কোরআনের তিনটি স্থানে কুরবানির উল্লেখ আছে যার একটি পশু কুরবানির ক্ষেত্রে এবং বাকি দুটি সাধারণ ভাবনার কাজ বোঝাতে যা দ্বারা আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়।

ঈদুল আযহা দিবসে কুরবানী করা ব্যতীত বনি-আদমের অন্য কোনো আমল আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে অধিক পছন্দনীয় নয়। কিয়ামত দিবসে ঐ পশু উহার শিং, লোম এবং খুরসহ উপস্থিত হইবে। আর কুরবানীর রক্ত মাটিতে পতিত হইবার পূর্বে আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে বিশিষ্ট স্থান লাভ করে। সুতরাং তোমরা কুরবানী করিয়া সস্তুষ্ট থাকিও  (আল  হাদিস) । 


কুরবানীর কতিপয় বিশেষ নিয়মাবলি ও বিধিবিধান হলো:




১। যিলহজ মাসের ১০ তারিখ ফজর হতে ১২ তারিখ সন্ধ্যা পর্যন্ত যদি কেউ নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক (সাহিবে নিসাব) হয়, তবে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব। মুসাফিরের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।

২। যিলহজ মাসের ১০, ১১, এবং ১২ তারিখ তিন দিন কোরবানির সময়। এ তিন দিনের যেকোনো দিন কুরবানী করা যায়। তবে প্রথম দিন কুরবানী করা উত্তম।

৩। ঈদুল আযহার নামাযের আগে কুরবানী করা সঠিক নয়। নামায আদায়ের পর কুরবানী করতে হয়।

৪। সুস্থ সবল ছাগল,ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ, উট ইত্যাদি গৃহপালিত পশু দ্বারা কুরবানী করতে হয। গরু, মহিষ, উটে এক হতে সাত জন পর্যন্ত শরিক হয়ে কুরবানী করা যায়।

৫। কুরবানীর ছাগলের বয়স কমপক্ষে এক বছর হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে দুই বছরের হতে হবে। উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে। দুম্বা ও ভেড়ার বয়স ছাগলের মতো। তবে ছয় মাসের বেশি বয়সের দুম্বার বাচ্চা যদি এরুপ মোটাতাজা হয় যে, এক বছরের অনেকগুলো দুম্বার মধ্যে ছেড়ে দিলে চেনা যায় না, তবে সেরুপ বাচ্চা দিয়ে কুরবানী জায়েয। কিন্তু ছাগলের বয়স এক বছর না হলে কুরবানী জায়েয হবে না।

৬। কুরবানীর গোশত সাধারণত তিন ভাগ করে এক ভাগ গরিব মসিকিনকে, একভাগ আত্নীয় স্বজনকে দিতে হয় এবং একভাগ নিজের জন্য রাখা উত্তম।

৭। নিজ হাতে কুরবানী করা উত্তম।

৮।কুরবানীর পশু দক্ষিণ দিকে মাথা রেখে কিবলামুখী করে, ধারলো অস্ত্র দ্বারা ’বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করতে হয়।

প্রত্যেক মুসলমানের উচিত কুরবানীর সময় একাগ্রতার সাথে উত্তম পশু কুরবানী করা। তাতে তাঁরা অনেক সাওয়াব পাবে। পরস্পরের মধ্যে আস্তকরিকতা বাড়বে এবং হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

কুরবানীর ত্যাগের শিক্ষা:


কুরবানী বলতে শুধু গরু, ছাগল, মহিষ, উট, দুম্বা ইত্যাদি জবাই করা বোঝায়না। বরং এর দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালার সস্তুষ্টি লাভ বোঝায়। কুরবানী আল্লাহর নবি হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) এর অতুলনীয় ত্যাগের স্মৃতি বহন করে। এর মাধ্যমে মুসলমানগণ ঘোষণা করেন যে, তাদরে কাছে নিজ জানমাল অপেক্ষা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মূল্য অনেক বেশি। কে কত টাকা খরচ করে পশু ক্রয় করেছে, কার পশু কত মোটা তাজা, কত সুন্দর আল্লাহ তা দেখতে চাননা। তিনি দেখতে চান কার অন্তরে কতটুকু আল্লাহর ভালোবাসা ও তাকওয়া আছে।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন: “কখনো আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।”(সূরা আল-হাজ ৩৭)

যিলহজ মাসের কতিপয় আমল:

প্রথম দশ দিনের নবম তারিখ পর্যন্ত রোযা রাখা। এ সম্পর্কে রাসূল (স:) বলেন: আল্লাহ তা’য়ালার নিকট যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের এবাদত অপেক্ষা অধিক পছন্দনীয় আর কোন এবাদত নাই। উহার প্রতিটি দিনের রোযা এক বৎসরের রোযার সমতুল্য। বিশেষ করে আরাফাত দিবসের রোযা যাহার সম্পর্কে রাসূল (স:) বলেন: আমি আল্লাহ পাকের দরবারে আশা রাখি, আরাফাত দিবসে রোযা রাখিলে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বৎসরের গোনাসমূহ মা’ফ করিয়া দিবেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ যে ব্যক্তির নিকট কুরবানীর পশু আছে, সে যেন জ্বিলহজ্জ এর নতুন চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে। (সহীহ মুসলিম)

আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে, গতানুগতিক অনুষ্ঠান সর্বস্ব কুরবানী না করে, কুরআন হাদিস অনুযায়ী কুরবানী করার এবং সওয়াব অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমিন ।
লেখক: মাও: কাউছার আহমেদ,সহকারী শিক্ষক (ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা), টেপিরবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়।